রংপুরের বরেণ্য শিক্ষাবিদ, চিন্তাবিদ ও কারমাইকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মুহম্মদ রেজাউল হক আর নেই। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৮টায় তিনি ডক্টরস কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
আজ রোববার কারমাইকেল কলেজ মসজিদ প্রাঙ্গণে তাঁর নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় কারমাইকেল কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষসহ সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব, নানা সংগঠনের প্রতিনিধি এবং কারমাইকেল কলেজ প্রাক্তন ছাত্র সমিতির নেতৃবৃন্দ অংশ নেন। জানাজা শেষে মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া করা হয়।
অধ্যাপক ড. মুহম্মদ রেজাউল হক ১৯৩৪ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মিঞা বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা আলতাফুল হক কলকাতার ক্যামবেল মেডিকেল স্কুলে অধ্যয়নকালে অসহযোগ আন্দোলনে যুক্ত হন এবং পরবর্তীতে চিকিৎসা ও সমাজসেবাকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। তাঁর মা ছিলেন সময়ের তুলনায় আধুনিক মননের একজন নারী; ১৯৫১ সালে চিলমারীতে প্রথম মহিলা সমিতি গঠনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এবং সেই সমিতির সভানেত্রী ছিলেন।
এই আলোকিত পারিবারিক পরিবেশ থেকেই গড়ে ওঠেন অধ্যাপক রেজাউল হক। ১৯৫০ সালে চিলমারী ইংলিশ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে তিনি ভর্তি হন কারমাইকেল কলেজে। ১৯৫২ সালে এখান থেকে আইএসসি পাস করার পর রাজশাহী কলেজের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে স্নাতক সম্মানে দ্বিতীয় শ্রেণীতে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তরে দ্বিতীয় শ্রেণীতে তৃতীয় স্থান লাভ করেন। ১৯৭৭ সালে তিনি সরকারি মনোনয়নে পিএইচডির জন্য নির্বাচিত হন এবং ভারতের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষণা সম্পন্ন করেন।
তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৫৮ সালে সিলেটের মদনমোহন কলেজে। ১৯৬১ সালের ৮ আগস্ট তিনি ঢাকা বিজ্ঞান কলেজে যোগদানের মাধ্যমে সরকারি কলেজে শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন। কর্মজীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি কারমাইকেল কলেজে একাধিক মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। পিএইচডি সম্পন্নের পর ১৯৮১ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত কারমাইকেল কলেজের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি গাইবান্ধা সরকারি কলেজ ও দিনাজপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯০ সালে তিনি পুনরায় কারমাইকেল কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৯১ সালে এখান থেকেই অবসর গ্রহণ করেন।
অধ্যক্ষ থাকাকালীন সময়ে তাঁর নেতৃত্বে কারমাইকেল কলেজের ৭৫ বর্ষপূর্তি উৎসব অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও জমকালো আয়োজনের মাধ্যমে উদযাপিত হয়, যা আজও অনেকের কাছে একটি সফল আয়োজনের উদাহরণ হিসেবে স্মরণীয়।
কর্মজীবনে তিনি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও জগন্নাথ কলেজের অধ্যক্ষসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে যোগদানের সুযোগ পেলেও শিক্ষকতা পেশার প্রতি গভীর অনুরাগের কারণে সেসব প্রস্তাব বিনয়ের সঙ্গে উপেক্ষা করেন।
ব্যক্তিজীবনে অধ্যাপক ড. মুহম্মদ রেজাউল হক ছিলেন একজন আদর্শ অভিভাবক ও পারিবারিক মানুষ। অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় তিনি তাঁর সহধর্মিণীর সঙ্গে সংসার জীবন কাটান। তাঁর এক পুত্র ও দুই কন্যা রয়েছেন। পুত্র একজন প্রকৌশলী হিসেবে একটি বৃহৎ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত, বড় কন্যা স্বামীসহ শ্রীলঙ্কায় অবস্থান করছেন এবং ছোট কন্যা একজন চিকিৎসক হিসেবে বারডেমে কর্মরত।
শিক্ষকতা ছাড়াও তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, দক্ষ সংগঠক ও সমাজসেবক। তাঁর জ্ঞান, নিষ্ঠা ও মানবিকতায় আলোকিত হয়েছে হাজারো শিক্ষার্থীর জীবন। তিনি রয়ে যাবেন কারমাইকেল কলেজসহ উত্তরবঙ্গের শিক্ষা ইতিহাসের এক অনন্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে।
হাজারো মানুষ গড়ার কারিগর এই প্রিয় শিক্ষককে হারিয়ে শিক্ষা অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোক।
মন্তব্য করুন